গ্রন্থাগার

Library

শিক্ষার জন্য, শিক্ষিত জাতির জন্য গ্রন্থাগার একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রন্থাগারের এই চিরন্তন মূলমন্ত্র কে পাথেয় হিসেবে সামনে রেখে গণগ্রন্থাগার দেশ ও জাতির কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে স্বীকৃত এক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সমাজের অশিক্ষা দূরীকরণে ফলপ্রসু প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গ্রন্থাগার দেশের গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও একটি অবিচ্ছেদ্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান।আমাদের প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় পাঠ্য পুস্তক এর পাশাপাশি বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও অন্যান্য বিষয় ভিত্তিক পুস্তক রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের এবং বিদ্যানুরাগীদের জ্ঞান পিপাসা মেটায়।

গ্রন্থাগারের ইতিহাস

সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সভ্যতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় একের পর এক কীর্তিস্তম্ভ গড়ে তুলেছে মানুষ, সমৃদ্ধ হয়েছে নানা অর্জনে। মানুষের চিরন্তন কীর্তির তালিকায় এমনই একটি অসাধারণ অর্জন গ্রন্থাগার। জ্ঞান সৃষ্টি, সেই জ্ঞানের কাঠামোবদ্ধ সংরক্ষণ এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জ্ঞানের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করেছে গ্রন্থাগার।

সভ্যতার সেই আদিকাল থেকেই কোনো না কোনো রূপে লিপিবদ্ধ জ্ঞানকে সংরক্ষণ করে আসছে মানুষ। ইতিহাসের একেবারে প্রাথমিক পর্বে গ্রন্থাগারগুলো আধুনিক গ্রন্থাগারের চেয়ে একেবারেই অন্য রকমের ছিল। গ্রন্থাগার ইতিহাসবিদরা এগুলোকে ‘প্রোটো লাইব্রেরি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এগুলো ছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে গড়ে তোলা সংগ্রহশালা যেগুলো কালের আবর্তে এক সময় গ্রন্থাগারে পরিণত হয়। গ্রন্থাগার বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মন্দিরে গড়ে ওঠা সংগ্রহশালা গুলোই গুরুত্বের বিচারে এগিয়ে ছিল। মিশর, প্যালেস্টাইন, ব্যাবিলন, গ্রিস এবং রোমে গ্রন্থাগারের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে মন্দির গ্রন্থাগার ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। গুরুত্বের দিক দিয়ে এরপরই উল্লেখ করতে হয় সরকারি দলিলদস্তাবেজের সংগ্রহ বা আর্কাইভসের কথা। গ্রন্থাগারের আদিমতম নিদর্শনগুলোর মধ্যে সরকারি নথির সংগ্রহাগার একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এসব দলিলপত্র লিপিবদ্ধ হত পোড়ামাটির ফলক, প্যাপিরাস বা পার্চমেন্ট রোল এবং কখনও তাম্র বা ব্রোঞ্জপাত্রে। তবে যেআকারেই সংরক্ষিত হোক না কেন, সরকারি কর্মকান্ডের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে ইতিহাস রচনার একটি অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে এসব সংগ্রহ। সরকারি দলিল ও মন্দির সংগ্রহের মতই ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের ফলস্বরূপ সৃষ্ট দলিলপত্রও গ্রন্থাগার উদ্ভবের আদি পর্বের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। মিশর, ফিনিশীয়া, ব্যাবিলন এবং পরবর্তীকালে আলেকজান্দ্রিয়া, এথেন্স ও রোমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্রগুলোতে এ ধরনের সংগ্রহ প্রচুর দেখা যেত। গ্রন্থাগারের ইতিহাসের প্রাথমিক পর্বে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সংগ্রহও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। লিখিত দলিলপত্রের সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণগুলোর মধ্যে বেশ কিছু দলিল আছে যেগুলো ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে লেখা। ব্যাবিলনের অধিবাসীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ ঘটনাবলীর পূর্বাভাস বা পূর্বলক্ষণের বিবরণ পারিবারিক সংগ্রহে যোগ করার প্রবণতা ছিল। ধর্মীয় কাহিনী ও ভাষ্য, পূরাণ ও লোককাহিনী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক নথিপত্র পারিবারিক সংগ্রহে যুক্ত হয়ে এগুলোকে আদর্শ ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে পরিণত করেছিল। এভাবেই পারিবারিক আর্কাইভসমূহ ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের পূর্বসূরী হিসেবে কাজ করেছিল এবং গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার একটি অতিস্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়।

মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে (আধুনিক ইরাক) প্রাপ্ত প্রায় ৩০,০০০ পোড়ামাটির ফলক নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলো প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরোনো। প্রত্নতত্ববিদরা প্রাচীন মিশরীয় নগরী আমানরা এবং থিবিস-এ এমন প্যাপিরাস স্ক্রল খুঁজে পেয়েছেন যেগুলো ১৩০০-১২০০ খৃষ্ট-পূর্বাব্দে রচনা করা হয়েছিল। ৭০৪ থেকে ৬৮১খৃষ্ট-পূর্বাব্দের আসিরিয় সাম্রাজ্যের রাজধানী নিনেভায় আসিরীয় নৃপতি সেনাচেরিব-এর প্রাসাদে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে হাজার হাজার পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। সেনাচেরিব-এর পৌত্র রাজা আসুরবানিপাল-এর গ্রন্থাগার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে একটি। বেশির ভাগ সময়ই প্রভাবশালী নৃপতি বা ধনবান মানুষদের বিদ্যাস্পৃহার ফলস্বরূপ গড়ে তোলা হয়েছে গ্রন্থাগার, প্রবল ভালবাসায় রক্ষা করা হয়েছে সেগুলোকে, সভ্যতার নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের জ্ঞানস্পৃহার অমর সাক্ষী হিসেবে টিকে থেকেছে গ্রন্থাগার, সভ্যতার অন্যতম মহান অর্জন হিসেবে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা সব সভ্যতায় গ্রন্থাগার ও জ্ঞানচর্চা হাত ধরাধরি করে চলে। মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস, রোম, এশিয়া মাইনর, ভারত, চীন-সর্বত্রই নৃপতিদের উৎসাহ ও সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে বিখ্যাত সব গ্রন্থাগার। এসবের মধ্যে আসুরবানিপাল, আলেকজান্দ্রিয়া, পার্গামাম ও নালন্দা গ্রন্থাগার বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থাগারের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। প্রাচীন অ্যাসিরিয়ার নিনেভা শহরে অবস্থিত এবং রাজা আসুরবানিপাল প্রতিষ্ঠিত রাজকীয় গ্রন্থাগারটি প্রাচীন বিশ্বের সর্বপ্রথম বৃহৎ গ্রন্থাগার, যাতে হাজার হাজার কাদামাটির ফলক সংরক্ষিত হয়েছিল সে সময়কার শ্রেষ্ঠ সব রচনাকর্ম। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে টলেমি বংশোদ্ভুত গ্রিক শাসকদের প্রতিষ্ঠিত আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারও নানা কারণে ইতিহাসখ্যাত। কার্লটন ওয়েলস-এর মতে, ‘প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময় জাগানিয়া এক সৃষ্টি ছিল এই আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার।’ এরকমই আরেকটি ইতিহাসখ্যাত গ্রন্থাগার পারগামাম গ্রন্থাগার যেটি আধুনিক তুরস্কের ইজমির অঞ্চলের পার্গামাম শহরে গ্রিক সেনাপতি প্রথম আট্টালাস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের গৌরব নালন্দা গ্রন্থাগার ভারতের বিহার রাজ্যের নালন্দা অঞ্চলে গুপ্তবংশীয় নৃপতিদের প্রতিষ্ঠিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারটি মোট তিনটি বহুতলবিশিষ্ট ভবনে অবস্থিত ছিল। এই তিনটি ভবনের নামছিল রত্নবোধি (ocean of pearls),রত্নসাগর (sea of pearls) এবং রত্নরঞ্জক (pearls of recreation)।

কেবল বই সংরক্ষণই নয়, গ্রন্থাগারটি বই সংকলন ও প্রকাশের সঙ্গেও জড়িত ছিল। এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন অনেক সুশিক্ষিত কর্মী। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারকে ঘিরে পান্ডুলিপি রচনা ও কপি করার একটি সক্রিয় চর্চা বিকাশ লাভ করেছিল। প্রতিনিয়ত বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্র এ কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এছাড়াও প্রাচীন ভারতের তক্ষশীলা, বিক্রমশীল, ওদন্তপুর, সোমপুর, জগদ্দলসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ সব গ্রন্থাগার।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় রাজা-বাদশাহ এবং আঞ্চলিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞানের চর্চা হত। কাদম্বরী-র রচয়িতা বিখ্যাত সংস্কৃত কবি বানভট্ট ভোজ অঞ্চলের রাজাদের প্রাসাদ গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক ছিলেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মন্দিরগুলোতে গড়ে ওঠে পান্ডুলিপির সংগ্রহ। ভারতের মুসলিম শাসকদের বেশিরভাগই গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারপ্রেমী ছিলেন। দিল্লীর সুলতানদের অধীনে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত অন্ততপক্ষে পাঁচ ধরনের গ্রন্থাগার গড়ে উঠার কথা জানা যায়, এগুলো হচ্ছে প্রাসাদ গ্রন্থাগার, শিক্ষায়তন গ্রন্থাগার, খানকাহ বা দরগাহ গ্রন্থাগার, মসজিদ গ্রন্থাগার এবং ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার।

ইসলাম যেহেতু জ্ঞানচর্চার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় সেহেতু দিল্লী সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সমস্ত মাদ্রাসায় টেক্সট ও রেফারেন্স বইয়ের একটি বিশেষ সংগ্রহ গড়ে তোলা হত। গোটা দেশ জুড়ে সুফী দরবেশদের খানকা শরীফে গড়ে ওঠে ধর্মীয় গ্রন্থাবলীর সংগ্রহ। সাধারণ মানুষদের পড়ার জন্য মসজিদে মসজিদেও গ্রন্থাগার গড়ে উঠে। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের মধ্যে সুফী নিজামুদ্দিন আউলিয়া এবং গাজী খান নামে সম্ভ্রান্ত বংশীয় একজন আফগান ভদ্রলোকের গ্রন্থাগার দুটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। একইভাবে গুজরাটের প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও বাহমনী রাজবংশের সদস্যরাও জ্ঞানচর্চা ও গ্রন্থাগার প্রীতির জন্য সমধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন। মুঘল সম্রাটরাও গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। মুঘল সম্রাটদের প্রায় সকলেই সমৃদ্ধ রাজকীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। নিজেদের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারপ্রীতির প্রমাণ দিতে তাঁরা সবসময়ই ছিলেন সচেষ্ট। মুঘল সম্রাটরা ছাড়াও মধ্যযুগের ভারতের অন্যান্য নৃপতি ও আঞ্চলিক শাসকরাও গ্রন্থাগারের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এঁদের মধ্যে জয়পুরের মহারাজা সাওয়াই মান সিং এবং পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঞ্জোরের মহারাজাও সরস্বতী মহল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর গ্রন্থাগারপ্রীতির পরিচয় দেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতে রাজা-বাদশাহরা ছাড়া পুঁজিপতি ও জমিদাররাও গ্রন্থাগারের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তবে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই এগুলোর ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকায় সমাজের সর্বস্তরের জনগণ এগুলো থেকে উপকৃত হতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে বৃটিশদের অধীনে গণগ্রন্থাগার বিস্তার ঘটার আগ পর্যন্ত এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এদেশে আগমন করলেও বৃটিশদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সত্যিকার অর্থেই শিক্ষানুরাগী। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করে বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠিত হোক এটা তারা চাইতেন। এছাড়া এখানে নিজেদের শাসনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যও একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠাটা বৃটিশদের স্বার্থের অনুকূল ছিল। বৃটিশ শাসকবর্গের এসব সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজ ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে গণগ্রন্থাগারের আদলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বেঙ্গল রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি ১৭৮৪ সালে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করে। কলকাতা গণগ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠা ১৮৩৫ সালে। এ গ্রন্থাগারটিই পরবর্তীকালে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি(১৯০৩) এবং স্বাধীন ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার (১৯৪৮)-এর রূপ লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পরিণতিতে পাকিস্তানের জন্মলাভের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের পূর্বসুরি পূর্ব পাকিস্তানের গ্রন্থাগার ভূবনে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয়। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিসহ অবিভক্ত ভারতের বেশির ভাগ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাগার ভৌগোলিক কারণে ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৮৫০ সালে ইংল্যান্ডে গণগ্রন্থাগার আইন পাশ হওয়ার পর এরই সূত্র ধরে এ উপমহাদেশে বেসরকারি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালানো হয়। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৫৪ সালে ৪ টি বেসরকারি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারগুলো হলো:

উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি, বগুড়া।

যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, যশোর।

বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি, বরিশাল।

রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি, রংপুর।

পরবর্তীতে ঢাকায় ১৮৭৪ সালে, ১৮৮১ সালে রাজশাহীতে, কুমিল্লায় ১৮৮৪, পাবনায় ১৮৯০ সালে, নোয়াখালি ও সিলেটে ১৮৯৭ সালে, নাটোরে ১৯০১ সালে, চট্টগ্রামে ১৯০৪ সালে, কক্সবাজারে ১৯০৬ সালে, মুন্সিগঞ্জে ১৯০৮ সালে, কিশোরগঞ্জে ১৯০৯ সালে, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও খুলনায় ১৯১৪ সালে, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহে ১৯৩০ সালে বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সমস্ত পাবলিক লাইব্রেরি সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সমাজকর্মী, বিদ্যুৎসাহীদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার কর্তৃক স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ যেমন-জেলাবোর্ড ও পৌরসভাকে পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়। কিস্তু তাঁরা নতুন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নেয়নি বললেই চলে। পরবর্তীতে জেলা ও থানা সদরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সমাজকর্মীদের দ্বারা বহু বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সমস্ত পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যে তেমন সমতা লক্ষ্য করা যায় না। গ্রন্থাগার সরকারের কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই প্রথমত এ গ্রন্থাগারগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ সমস্ত গ্রন্থাগারের সংগ্রহ খুবই কম। গ্রন্থাগারিক নেই বললেই চলে। তাছাড়া নিজস্ব ভবনও অনেক জায়গায় নেই। সবমিলিয়ে গ্রন্থাগার গুলো ভালভাবে চলছে তা বলা যাবে না।

১৯৯৪ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরির একটি জরিপ পরিচালনা করে। উক্ত জরিপে ৮৮৩ টি বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরি পাওয়া যায়। এ সমস্ত লাইব্রেরি গ্রাম এবং শহরাঞ্চলে অবস্থিত। বর্তমানে এই লাইব্রেরি গুলো সরকারি অনুদান, সদস্যদের চাঁদা, বিভিন্ন সংগঠনের অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ সমস্ত গ্রন্থাগারের স্থায়ী কোন ফান্ডের ব্যবস্থা নেই।

বেসরকারি গণগ্রন্থাগারসমূহ তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অধিকাংশ গ্রন্থাগারের পরিচালনা কমিটির প্রধান হলেন জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার।

ষাটের দশকে সারা দেশে ১১০ টি অনুদান প্রাপ্ত বেসরকারি গণগ্রন্থাগার ছিল। এসমস্ত গ্রন্থাগারগুলো প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাৎসরিক অনুদান দেয়া হতো কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের মাধ্যমে। এ প্রকল্প শেষ হওয়ার পর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুদান দেয়ার জন্য ১.৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমূহকে বাৎসরিক অনুদান দেয়া হয় যার অর্ধেক বই এবং অর্ধেক নগদটাকা প্রদান করা হয়।

সরকারি গণগ্রন্থাগার

গণগ্রন্থাগার গণতান্ত্রিক সমাজের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সমাজ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণ, অর্জিত শিক্ষার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হবার পরিবেশ সৃষ্টি, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক চেতনা, মূল্যবোধের বিকাশ এবং সর্বোপরি আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনে তথ্য পরিবেশন প্রভৃতি কাজে গণগ্রন্থাগারের অনন্য সাধারণ ভূমিকার প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকারের শিক্ষা বিভাগের ১০.০৫.১৯৫৫ তারিখের ১৪৯১-শিক্ষা সংখ্যক আদেশ বলে “সোস্যাল আপলিফট” প্রকল্পের অধীনে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক মঞ্জুরি প্রদান করা হয়। ১৯৫৮ সালের ২২ মার্চ ১০,০৪০ খানা পুস্তকের সংগ্রহ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গ্রন্থাগারটির দ্বারোম্মোচন করা হয়। ১৯৭৭ সালে গ্রন্থাগারটিকে শাহবাগ এলকায় বর্তমান অবস্থানে নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তর করা হয় এবং ০৬.০১.১৯৭৮ তারিখে নতুন ভবনে গ্রন্থাগার উদ্বোধন করা হয়। এ গ্রন্থাগার দেশের গণগ্রন্থাগার ব্যবস্থার মূল প্রতিষ্ঠান (Apex Organisation) হিসেবে কাজ করছে।

সরকার কর্তৃক নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ান লাইব্রেরি বিশেষজ্ঞ Mr. L.C. Key ১৯৫৬ সালে রিপোর্ট পেশ করায় সরকার দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগীয় শহরে একটি করে ২ টি বিভাগীয় লাইব্রেরি স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। উক্ত প্রকল্পের অধীন খুলনার বয়রায় ২২,৫০০ বর্গফুট আয়তনের দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। জুন ১৯৬৬ সালে ২৮,০০০ পুস্তকসহ গ্রন্থাগারটি উদ্বোধন করা হয়। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরি উন্নয়ন প্রকল্পের অধীন চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়, যার আয়তন ৪৬,০০০ বর্গফুট। বাংলাদেশ অভ্যুদ্বয়ের পর দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীন রাজশাহীতে ১৯৮৩ সালে ১৮,৫৭০ বর্গফুট আয়তন বিশিষ্ট একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রন্থাগারটি ১১,০০০ পুস্তক নিয়ে সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

১৯৮২ সালের ১৫ জুন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এর এক আদেশ বলে বাংলাদেশ পরিষদকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। প্রশাসনিক পূণর্গঠন সংক্রান্ত সামরিক আইন কমিটি (এনাম কমিটি) সরকারি গণগ্রন্থাগাসমূহ ও বিলুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদের অধীনেজেলা ও তৎকালীন মহকুমা (বর্তমানে জেলা) পর্যায় পর্যন্ত পরিচালিত গ্রন্থাগারসমূহ (তথ্য কেন্দ্র) সমন্বয়ে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর গঠনের পক্ষে সুপারিশ করে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সচিবালয়ের ০৯.১১.৮৩ তারিখে ৭০০২/১/সিভ-১ সংখ্যক প্রজ্ঞাপন মূলে উক্ত সুপারিশ অনুমোদিত হয়। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৮৩ সালে বিলুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদকে বিদ্যমান গণগ্রন্থাগার এর সাথে একীভূত করে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়।